বাংলাদেশ ক্রিকেটের মহানায়ক মাশরাফি: গুরু তোমায় সালাম

সময়টা ২০০১ সাল। একজন দীর্ঘদেহী টগবগে তরুন ফাস্ট বোলার হিসেবে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে জাতীয় দলে ডাক পেলেন মাশরাফি বিন মোর্তুজা। একই সিরিজে টেস্টেও ডাক পেয়েছেন খালেদ মাহমুদ। এরই মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভাব হয়েছিল এক উজ্জ্বল তারার। যার হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে

টেস্ট ক্যারিয়ারঃ-
০৮ নভেম্বর ২০০১ সালে শুরু হওয়া সিরিজের প্রথম টেস্টেই অভিষেক হয় মাশরাফির। একই সাথে অভিষেক হয় খালেদ মাহমুদ এর। ম্যাচে ট্রেভিস ফ্রেন্ড ও হেনরি ওলঙ্গার বোলিং তোপে পড়ে বাংলাদেশ মাত্র ১০৭ রানে অলআউট হয়। সর্বোচ্চ ৫ উইকেট শিকার করেন ফ্রেন্ড ও ১০ নাম্বারে নেমে সর্বোচ্চ ২৪ রান করেন এনামুল হক মনি। ৯ নাম্বারে নেমে মাশরাফি ৮ রান করে আউট হন। জিম্বাবুয়ে ব্যাট করতে নামলে মানজারুল ইসলাম এর বোলিং তোপে পড়ে মাত্র ৪ রানে দুই ওপেনারকে হারালেও মিডল ও লোয়ার অর্ডারের ৪ ব্যাটসম্যানের ফিফটিতে ৪৩১ রান করে জিম্বাবুয়ে। গ্রান্ড ফ্লাওয়ার এর উইকেট নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম উইকেট শিকার সহ ৩২ ওভারে ১০৬ রান দিয়ে ৪ উইকেট শিকার করেন মাশরাফি। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে হাবিবুল বাশারের ৬৫ রানের সুবাদে ৩ উইকেটে ১২৫ রান করার পর বৃষ্টির হানায় আর খেলা মাঠে না গড়ালে ম্যাচটি ড্র হয়।

তারপর ২০০৯ সালে আশরাফুল এর পর প্রত্যাশিত ভাবে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান মাশরাফি এবং সিরিজের প্রথম ম্যাচ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ৩৬টি টেস্ট খেলে ব্যাট হাতে ৭৯ রান বেস্টে ৩ ফিফটিতে ৭৯৭ রান করেন এবং বল হাতে ৪ উইকেট বেস্টে ৭৮ উইকেট শিকার করেন এবং ফিল্ডার হিসেবে ৯টি ক্যাচ ধরেন তিনি।

টেস্ট ক্রিকেটে একজন বোলার হিসেবে শুরু থেকেই দূর্দান্ত ছিলেন মাশরাফি। ক্যারিয়ারের প্রথম দুই টেস্টে ৪ উইকেট করে শিকার করেন। তৃতীয় টেস্টেও ৩ উইকেট শিকার করেন। এছাড়াও প্রতিটি টেস্টেই তিনি ভালো বোলিং করেন। বারবার ইনজুরী আক্রান্ত হওয়ার পর সর্বশেষ ২০০৯ সালে ইনজুরীতে পড়ে টেস্ট খেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন দেশের সেরা নিয়মিত টেস্ট বোলার।

২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের সাথে টেস্ট সিরিজ জয়েও মাশরাফির অবদান অসামান্য। জিম্বাবুয়েকে ২২৬ রানে হারানোর ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে মাত্র ৪৪ বলে ৪৮ রা ও দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯ রানের ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতে ৩ উইকেট বেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেন। পরের ম্যাচেও ব্যাট হাতে ২৬ রানের ইনিংস এর পাশাপাশি বল হাতে ৩ উইকেট বেস্টে দুই ইনিংসে ৪ উইকেট শিকার করেন। পুরো সিরিজেই অলরাউন্ডারিং পারফরম্যান্স করেন তিনি।

২০০৭ সালে টেস্টে দূর্দান্ত খেলেন মাশরাফি। বিশ্বকাপের পর ভারত বাংলাদেশে আসলে ২ টেস্ট সিরিজে ২টি ফিফটি করেন মাশরাফি। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় শেষের দিকে শাহাদাতকে নিয়ে দূর্দান্ত খেলেন তিনি। প্রথম টেস্টে দলীয় ১৪৯ রানে ৮ উইকেট পতনের পর ৭৯ রানের দূর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। শাহাদাতের সাথে জুটি বেধে ৭৭ রান সংগ্রহ করেন। শাহাদাত করেন ৩১ রান। বল হাতেও ৪ উইকেট বেস্টে ৫ উইকেট শিকার করেন। ফলশ্র“তিতে দূর্দান্ত অলরাউন্ডারিং পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে ম্যাচ সেরা হন। টেস্ট ক্রিকেটে এই একবারই ম্যাচ সেরা হয়েছেন মাশরাফি।

ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে দূর্দান্ত অলরাউন্ডারিং পারফরম্যান্স এর কারনে তখনকার সময়ে মাসিক/সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন/পত্রিকা সহ মানুষের মুখে মুখে একটাই ভাষ্য ছিল “ওয়ানডে অর টেস্ট মাশরাফি ইজ দ্যা বেস্ট”।

সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে আবারো ব্যাটিংয়ে দলের ত্রাণকর্তা মাশরাফি। ভারতের ৬১০ রানের জবাবে মাত্র ১১৮ রানে অলআউট হয়ে ফলোঅনে ব্যাট করতে নেমে আবারো দলের চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে হাল ধরেন তিনি। দলীয় ১৫০ রানে ৬ উইকেট পতনের পর ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৬৮ বলে ৭০ রানের দূর্দান্ত ইনিংস খেলেন। বল হাতেও ১ উইকেট শিকার করেন প্রথম ইনিংসে। প্রথম টেস্ট ড্র হলেও দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ২৩৯ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজয় বরণ করে বাংলাদেশ।

২০০৭ সালের ধারাবাহিকতা ২০০৮ সালেও বজায় রাখেন মাশরাফি। ২০০৮ সালের নিউজিল্যান্ড এর বিরুদ্ধে ঘরের মাটিতে পর পর দুই টেস্টে ৪৪ ও ৪৮ রানের ইনিংস খেলেন।

একই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে শ্রীলংকার সাথে ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি তথা ৬৭ রানের ইনিংস খেলেন এবং অধিনায়ক হিসেবে ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে খেলা ১ম টেস্ট ম্যাচেও ৩৯ রানের ইনিংস খেলেন।

ওয়ানডে ক্যারিয়ারঃ-
২০০১ সালেই জিম্বাবুয়ের সাথে ওয়ানডে অভিষেক। ম্যাচে হাবিবুল বাশারের ৪৪ ও খালেদ মাসুদের ৪৪ রানের পরও অন্যান্যদের ব্যর্থতায় ফ্রেন্ড ও ব্রেন্ট এর বোলিং তোপে পড়ে ১৫৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। জবাবে উইশার্ট এর ৭৯ রানের সুবাদে ৫ উইকেটে জয়লাভ করে জিম্বাবুয়ে। ৮.২ বলে মাত্র ২৬ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন মাশরাফি।

তারপর ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিউজিল্যান্ড সিরিজের শেষ ওয়ানডে খেলা পর্যন্ত১৬৯টি ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে অপরাজিত ৫১ রান বেস্টে ১ ফিফটিতে ১৫৪০ রান করেন এবং বল হাতে ৬ উইকেট বেস্টে ২১৯ উইকেট শিকার করেন। ফিল্ডার হিসেবে ৫৩টি ক্যাচ ধরেন তিনি। (এশিয়া একাদশের হয়ে ১ উইকেট শিকার করেছেন, বাংলাদেশের হয়ে ২১৮টি)

ওয়ানডেতে ২০০৪ সালে ভারতকে হারানোর ম্যাচের নায়ক মাশরাফি। ম্যাচে ব্যাট হাতে অপরাজিত ৩১ রান করার পর বল হাতে ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন। পরের ম্যাচেও ব্যাট হাতে ৩৯ রানের ইনিংস খেলেন।

২০০৫ সালটা মোটেও ভালো কাটেনি মাশরাফির। এই সময়ে ১০টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ২ উইকেট বেস্টে মাত্র ৭ উইকেট শিকার করেন। ব্যাট হাতেও তেমন ভালো করতে পারেননি। অপরাজিত ২৯ রান বেস্টে ৭৬ রান করেন।

২০০৫ সালে আহামরি কিছু করতে না পারলেও ২০০৬ সালেই নিজের সেরাটা দেন মাশরাফি। ব্যাটে বলে একজন পারফেক্ট অলরাউন্ডারিং পারফরম্যান্স করেন। বছরের শুরুতেই কেনিয়ার সাথে বগুড়ায় মাত্র ১৬ বলে অপরাজিত ৪৪ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন এবং এই ম্যাচেই বাংলাদেশ ওয়ানডেতে প্রথমবারের মতো ৩০০ রান করে। ৯১ রান করে ম্যাচসেরা হন শাহরিয়ার নাফিজ।

এই সময়ে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই ব্যাটে কিংবা বলে ভালো করতে থাকাবস্থায় কেনিয়ার সাথে নাইরোবিতে আবারো খেলেন অপরাজিত ৪৩ রানের ইনিংস ও বল হাতে ৩ উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরা হন। পরের ম্যাচেই করেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। ১০ ওভারে মাত্র ২৬ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরা হন। সেই সাথে সিরিজ সেরাও হন মাশরাফি।

২০০৬ সালের শেষের দিকে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে সিরিজে টানা তিন ম্যাচে ৩ উইকেট করে শিকার করা সহ মোট ১১ উইকেট শিকার করেন এবং বছরের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ড এর সাথে ক্যারিয়ার সেরা ব্যাটিং ও একমাত্র অপরাজিত ফিফটি ৫১ রান করেন ও ২ উইকেট শিকার করে ম্যাচ সেরা হন।

২০০৬ সালে ২৭টি ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ৫১ রান বেস্টে ২২.৬৯ এভারেজে ২৯৫ রান করেন। বল হাতে ৬ উইকেট বেস্টে ৪৯ উইকেট শিকার করে দেশ সেরা অলরাউন্ডারিং পারফরম্যান্স করেন।

২০০৬ সালে দূর্দান্ত সাফল্যের বৎসরেই জিম্বাবুয়ে টেইলরের কাছে শেষ ওভারে ১৭ রান দিয়ে দলের জেতা ম্যাচ হারিয়েছেন। বাংলাদেশের তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএল এ খেলে সেখানেও শেষ ওভারে ২৪ রানের প্রয়োজনে ২৬ রান দিয়ে জেতা ম্যাচ হারিয়েছেন। এছাড়াও ওয়ানডেতে শেষের দিকে খেই হারিয়ে ফেলতেন কিছু কিছু ম্যাচে।

২০০৭ সালের শুরুটাও দূর্দান্ত হয়েছিল মাশরাফির। বছর ও জিম্বাবুয়ে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই ৪ উইকেট শিকার করেন এবং সিরিজের শেষ ম্যাচেও ৩ উইকেট শিকার করেন। তৎপর বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ভারতের সাথে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন। এ ম্যাচে সেবাগকে দূর্দান্ত ডেলিভারীতে আউট করেন, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে এখনও গেঁথে আছে। বিশ্বকাপে ৯টি ম্যাচ খেলে মাত্র ৪ ম্যাচেই ৯ উইকেট শিকার করেন। ৫ ম্যাচে কোন উইকেট পাননি। তবে অজিদের সাথে অপরাজিত ২৫ ও দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে ৩৭ রানের ইনিংস খেলেন।

বিশ্বকাপ শেষে ভারতের বিরুদ্ধে হোম সিরিজের একমাত্র ওয়ানডে ম্যাচেও মাত্র ২২ বলে ৪২ রানের দূর্দান্ত ইনিংস খেলেন। এই ম্যাচে ভারতীয় স্পিনার দিনেশ মঙ্গিয়াকে টানা ৪ বলে ৪টি ছয় মারেন তিনি।

২০০৮ সালেও ব্যাট হাতে সফল ছিলেন মাশরাফি। এই সময়ে ২৫, ২৬, ৩৮, ৩৪, ২৭, ৩৪ রানের ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৪ উইকেট এবং নিউজিল্যান্ড এর বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই ৪ উইকেট নিয়ে দলকে জয়ী করেন। অবশ্য ৮৫ রান করে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন জুনায়েদ সিদ্দিকী। অধিনায়ক আশরাফুল করেছিলেন ৬০ রান।

ক্যারিয়ারের শুরুর পর ২০০২-০৫ পর্যন্ত কিছুদিন পর পরই ইনজুরী আক্রান্ত হওয়ার পর ২০০৬-০৮ পর্যন্ত টানা ম্যাচ খেললেও ২০০৯ সালে অধিনায়কত্ব পেয়েই ইনজুরী পড়েন মাশরাফি। তারপরও ২০০৯ সালে মাত্র ৬টি ওয়ানডে খেলে ৩ উইকেট বেস্টে ১২ উইকেট শিকার করেন।

২০১০ সালে ইনজুরী থেকে ফিরে আবারো অধিনায়কত্ব পেয়ে ইংল্যান্ড সফরে দূর্দান্ত বল করেন মাশরাফি। তার অধিনায়কত্বেই ইংল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো হারায় বাংলাদেশ দল। ব্যাট হাতে ২২ রান ও ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন মাশরাফি। একই বৎসর আবারো ইনজুরী আক্রান্ত হয়ে পড়েন মাশরাফি। যার দরুন ২০১১ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের পূর্বে নিজেকে সুস্থ হিসেবে দাবী করলেও বিশ্বকাপের দলে রাখা হয়নি মাশরাফিকে। সে সময়ে মাশরাফির হতাশা ও কান্না সারা দেশবাসীকে আহত করেছিল দারুন ভাবে। বিশ্বকাপ শেষে অষ্ট্রোলিয়া সিরিজে দলে ফিরেই দূর্দান্ত বল করেন মাশরাফি। ২ ম্যাচে ৫ উইকেট শিকার করেন। ২০১১ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে খেলতে না পারলেও সৃষ্টিকর্তা ২০১৪ সালের শেষের দিক থেকেই দু’হাত ভরে সবকিছু দিয়েছেন মাশরাফিকে। দলীয় ও ব্যক্তিগত সাফল্য এবং এ দেশের মানুষের অগাধ ভালোবাসা, সবই পেয়েছেন মাশরাফি।

২০১২-২০১৩ সালেও ইনজুরীর কারনে বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি মাশরাফি। তবে যে ম্যাচগুলো খেলেছেন, ব্যাটে কিংবা বলে দলকে ভালো সার্ভিস দিয়েছেন। ২০১৪ সালের শেষের দিকে জিম্বাবুয়ে সিরিজে মুশফিকের পরিবর্তে ওয়ানডেতে আবারো অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান মাশরাফি।

এই সময়ে দূর্দান্ত অধিনায়কত্বের পাশাপাশি ব্যাট হাতে ৩৯, ২১, ৪৪ রানের ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতেও প্রায় ম্যাচে ২,৩,৪ উইকেট শিকার করেন। ব্যাটে বলে এবং অলরাউন্ডাররিং পারফরম্যান্স মিলিয়ে তিনি ইতিহাসের সেরা অধিনায়কদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই সাথে দেশের সেরা অধিনায়ক হিসেবেও সফলতা অর্জন করেন মাশরাফি।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ওয়ানডেতে মাশরাফির উইকেট সংখ্যা ২১৯ (একটি এশিয়া একাদশের ম্যাচে) এবং বাংলাদেশ দলের হয়ে ২১৮টি উইকেট শিকার করেন।

ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০০৪ সালে ভারত বধের ম্যাচে সেরা হওয়া থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের ইংল্যান্ড সিরিজে ম্যাচ সেরা হওয়া পর্যন্ত মোট ১২বার ওয়ানডেতে ম্যাচ সেরা হয়েছেন। যার মধ্যে ২০০৬ সালেই সর্বোচ্চ ৪ বার ম্যাচসেরা হয়েছেন তিনি।

টি২০ ক্যারিয়ারঃ-
২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের সাথে নিজেদের প্রথম টি২০ ম্যাচেই অভিষেক। ম্যাচে মাত্র ২৬ বলে ২ চার ও ২ ছয়ে ৩৬ রান করেন। অধিনায়ক নাফিজের ২৫, আফতাব এর ২৮ ও মাশরাফির ৩৬ রানের সুবাদে ১৬৬ রান করে বাংলাদেশ। জবাবে আব্দুর রাজ্জাক ও শাহাদাত এর বোলিং তোপে পড়ে মাত্র ১২৩ রানে অলআউট হয় জিম্বাবুয়ে। রাজ্জাক ৩, শাহাদাত ২, মাশরাফি, সাকিব ও রফিক ১ উইকেট করে শিকার করেন। সর্বোচ্চ ৩৮ রান করেন উইলিয়ামস।

তারপর ২০১৭ সালের ৮ই জানুয়ারী নিউজিল্যান্ড এর সাথে খেলা টি২০ মাচ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে ৫২টি ম্যাচ খেলে ৩৬ রান বেস্টে ৩৬৮ রান ও বল হাতে ৪ উইকেট বেস্টে ৩৯ উইকেট শিকার করেন। ফিল্ডার হিসেবে ৯টি ক্যাচ ধরেন।

২০০৬ সালের নিজের ও দলের অভিষেক টি২০ ম্যাচেই ৩৬ রান করে এবং ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হন মাশরাফি।

টি২০ ম্যাচে ব্যাট হাতে ৩৬, ৩৩, ৩০,১৯ রানের ইনিংস খেলেন। বল হাতে একবার ৪ উইকেট এবং বেশ কয়েকবার ২ উইকেট করে শিকার করেন।

টি২০ ম্যাচে ক্যারিয়ার সেরা ৪ উইকেট পান আয়ারল্যান্ড এর বিরুদ্ধে। এ ম্যাচে ব্যাট হাতেও রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন মাশরাফি। মাত্র ১৩ বলে ৪টি ছয়ে ৩০ রানের ইনিংস খেলেন। ব্যাটে বলে দূর্দান্ত খেলে ম্যাচ সেরা হন মাশরাফি।

মাশরাফির ব্যাটিং টি২০ আদর্শ হলেও ৫২টি ম্যাচ খেলেও ঠিক জ্বলে উঠতে পারেননি ব্যাট হাতে। বলতে গেলে শেষের দিকে ব্যাট করার কারনে অনেক ম্যাচেই ব্যাট করার সুযোগ হয়নি কিংবা ব্যাট হাতে নেমে বেশি বল খেলার সুযোগ হয়নি।

টি২০ ম্যাচে ব্যাটিংটাকে একপাশে রেখে বোলার মাশরাফি বেশ নি®প্রভই বলা যায়। ৫২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে মাত্র এক ম্যাচে ৪ উইকেট শিকার করেছেন, কখনো তিন উইকেট পাননি এবং ৯টি ম্যাচে ২ উইকেট করে শিকার করেছেন। ৫২ ম্যাচের ফলাফল ৪ উইকেট বেস্টে মাত্র ৩৯ উইকেট। তাছাড়া টি২০ ম্যাচের সবচেয়ে বড় হিসাব ইকোনোমি রেটও ভালো নয় তার। ওভার প্রতি ৮.৫ রান দিয়েছেন, যা টি২০ ক্রিকেটে খরুচে বোলার হিসেবেই গন্য হয়।

টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশ ও নিজের অভিষেক ম্যাচেই ম্যাচসেরা হয়েছেন এবং সর্বশেষ ২০১২ সালে আয়ারল্যান্ড এর বিরুদ্ধে ম্যাচসেরা হয়েছেন। টি২০ ক্রিকেটে মোট ২ বার ম্যাচ সেরা হয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩ ফরম্যাট মিলিয়ে একমাত্র ওয়ানডেতেই ২ বার সিরিজ সেরা হয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালে কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে সিরিজ সেরা হয়েছেন।

ঘরোয়া ক্রিকেটঃ-
৫৪টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলে অপরাজিত ১৩২ রান বেস্টে ও ৬ ফিফটিতে ১৪৩৩ রান সংগ্রহ করেন এবং বল হাতে ৪ উইকেট বেস্টে ১২৯ উইকেট শিকার করেন।

২২০টি লিষ্ট এ ম্যাচ খেলে ১০৪ রান বেস্টে ৭ ফিফটিতে ২৪৯৩ রান সংগ্রহ করেন এবং বল হাতে ৩০৪ উইকেট সংগ্রহ করেন।

১২০টি টি২০ ম্যাচ খেলে অপরাজিত ৫৬ রান বেস্টে ৭৬৮ রান সংগ্রহ করেন এবং বল হাতে ৯৮ উইকেট শিকার করেন। (ক্রিকইনফোর তথ্য মতে লিষ্ট এ ও টি২০ এর হিসাব আন্তর্জাতিক ম্যাচ সহও হতে পারে)

তাছাড়া বিপিএল এর টানা দুই বৎসর ঢাকা গ্লাডিয়েটসর এর অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জিতেন এবং ৪র্থ আসরে নতুন দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স এর অধিনায়ক হিসেবেও ৩য় বারের মতো শিরোপা জিতেন।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বারবার ইনজুরী আক্রান্ত হয়ে একজন ক্রিকেটার দলের স্বার্থে এবং ক্রিকেটকে ভালোবেসে পঙ্গু হয়ে যাবেন জেনেও যেভাবে দলকে সার্ভিস দিচ্ছেন, এই একটি জায়গায় সারা বিশ্বের মধ্যে অনন্য, অসাধারণ মাশরাফি।

এন্ড্রো ফিনটফ, শেন বন্ড সহ অনেক ফাস্ট বোলার যেখানে ২/৩ বার ইনজুরী আক্রান্ত হয়েই খেলা ছেড়ে দিয়েছেন জীবনের মায়া করে, সেখানে মাশরাফি ১২বার (গত ০৮/০১/১৬ইং তারিখ সর্বশেষবার) ইনজুরী আক্রান্ত হয়েও দেশের জন্য লড়ে যাচ্ছেন, সামনে থেকে নেতৃত্বে দিচ্ছেন। মাশরাফির নেতৃত্বেই বাংলাদেশ একটি গোছানো দলে পরিণত হয়েছে।

দেশসেরা পেসার, একজন বিগ হিটার এবং একজন সফল অধিনায়ক হওয়ার কারনে বর্তমানে মাশরাফির কোন কট্টর সমালোচক নেই। ক্রিকেটের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং ব্যক্তি মাশরাফিতেও মুগ্ধ এ দেশের প্রতিটি মানুষ।

ওয়ানডে ক্রিকেটে দলের হয়ে প্রথম উইকেট শিকার কিংবা দলীয় ও নিজের প্রথম ওভারেই উইকেট শিকার করা এবং মাশরাফির প্রথম উইকেট পাওয়া মানেই বাংলাদেশের জয়, অনেক ম্যাচেই সেটা প্রমাণ হয়েছে।

রফিক, আফতাব, আশরাফুল, তামিম, সাকিব সহ আরো অনেকেই দ্রুতগতিতে ব্যাট চালাতে পারদর্শী হলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটে সত্যিকারের একজন বিগহিটার মাশরাফি। যিনি অবলীলায় বলকে সীমানা ছাড়া করতে পারতেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে মাত্র ১৬ বলে ৪৪, টি২০ ক্রিকেটে মাত্র ১৩ বলে ৩০ এবং প্রায় ম্যাচেই ছোটখাটো ঝড় তুলতেন তিনি। তাছাড়া কয়েকমাস আগে লিষ্ট এ ম্যাচে মাত্র ৫৬ বলে সেঞ্চুরী করে নিজেকে বিগহিটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

মাশরাফির আগ্রাসী মনমানসিকতা, লড়াই করার প্রবল ইচ্ছা এবং দেশপ্রেমই মাশরাফিকে অনন্য অসাধারণে পরিণত করেছেন।

ব্যক্তিগত ভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশ কয়েকবার ম্যাচসেরা এবং সিরিজ সেরা হলেও অধিনায়ক হিসেবে এখনো কোন ট্রফি জেতা হয়নি মাশরাফির। আসন্ন চ্যাম্পিয়নট্রফিতেও বাংলাদেশ ফেভারিট নয় এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের যে অবস্থা, তাতে করে সম্মানজনক খেলতে পারাটাই বড় কথা। তবে ৩ বার বিপিএল এর শিরোপাজয়ী অধিনায়ক হয়েছেন মাশরাফি।

মাশরাফি কোন আন্তর্জাতিক ট্রফি জিততে পারেননি, ভক্তদের কাছে এটা হতাশার হলেও ঘরের মাঠে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে খেলতে না পারার মতো হতাশার কোন বিষয়ে সম্ভবত মাশরাফির ক্রিকেট ক্যারিয়ারে আসেনি।

এমন অনেক অপ্রাপ্তির মধ্যেও মাশরাফি যা পেয়েছেন এবং দল ও দেশের মানুষকে যা দিয়েছেন, তা অনন্য, অসাধারণ। একচ্ছত্র ভাবে মানুষের ভালোবাসায় শিক্ত মাশরাফি, যার চেয়ে বড় কোন পাওয়া আর কিছুই হতে পারে না।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন সফল নেতা ব্যক্তিজীবনেও মা-বাবা, ভাই-বোন এবং দুই ছেলে মেয়ে ও পরিবারকে নিয়ে সুখী ও অতি সাধারণ জীবন যাপন করছেন, যা এ দেশের প্রতিটি মানুষকেই মুগ্ধ করেছে।

নিউজিল্যান্ড এর বিরুদ্ধে সর্বশেষ টি২০ সিরিজের শেষের ম্যাচে আবারো ইনজুরী আক্রান্ত হয়েছেন মাশরাফি। প্রায় ৭/৮ সপ্তাহ দলের বাইরে থাকতে হলেও মাশরাফি বলেই সাহস ও ভয় দুটোই কাজ করছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। বরাবরের মতো এবারও তিনি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরবেন, এটা যেমন প্রত্যাশা ঠিক তেমনি বারবার ইনজুরীতে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি আবারো মাঠে ফিরতে পারবেন কিনা, এমন ভাবনাও মনে উকি দিচ্ছে।

তবে সব চিন্তা ও হতাশাকে পেছনে ফেলে দ্রুতই সুস্থ হবেন মাশরাফি। চলতি বৎসরের চ্যাম্পিয়ন ট্রফি সহ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে দল নেতা হিসেবে পারফরম্যান্স করবেন এবং কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের পূর্বের সাফল্যকে পেছনে ফেলে নতুন সাফল্যের জোয়ারে ভাসাবেন বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে, ক্রিকেটপ্রেমীদের এই চাওয়া।

মাশরাফির ভক্ত সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত একটি ধারণা-
মাশরাফি ও আশরাফুল, দুজনেরই ২০০১ সালে অভিষেক হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে তামিম-সাকিব ব্যতিত বন্ধুত্ব সৃষ্টি ও জনপ্রিয়তা হিসেবে মাশরাফি ও আশরাফুলই ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং দুজনে মিলেই অনেক ম্যাচে বাংলাদেশকে জয়ী করেছেন। ২০১২-২০১৩ সাল পর্যন্তও আমি মনে করতাম, যারা আশরাফুল এর ভক্ত, তারাই মাশরাফির ভক্ত এবং যারা মাশরাফির ভক্ত, তারাই আশরাফুল ভক্ত। কিন্তু ২০১৩ সালে আশরাফুল এর ফিক্সিং কেলেঙ্কারীর পর এবং ২০১৪ সালের শেষের দিকে মাশরাফি অধিনায়কত্ব পেয়ে একেরপর এক ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করায় হুরহুরি করে মাশরাফির ভক্ত বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে সারা বাংলাদেশের মানুষই মাশরাফির ভক্ত। বাংলাদেশের দুঃসময়ের দুই কান্ডারীর একজন আজ ভিলেনে পরিণত হয়েছেন অনেক মানুষের কাছে এবং আরেকজন আজ সারা দেশের মানুষের প্রিয় মুখ, তিনিই মাশরাফি।

সবশেষে একটাই কামনা, আরো ২/৩ বৎসর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলবে মাশরাফি, দলকে জয়ী করবেন এবং পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করবেন, বর্তমানের মতো করেই সব সময় মানুষের মনে থাকবেন মাশরাফি।

জুবায়ের আহমেদ
ক্রীড়া লেখক






Related News

  • প্রত্যাবর্তনের মঞ্চেই যুবরাজ চরম অসম্মান করলেন তাঁর এই শুভানুধ্যয়ীকে, চমকে গিয়েছে গোটা দেশ
  • মেয়ের জন্য ৩৭ বছর বয়সী গেইলের ঘোষণা, ‘৫০ বছর বয়সেও আমি ক্রিকেট খেলবো’
  • ১৩ বছরের ফুটবলারের দাম শুনলে অবাক হতে হবে!
  • বৃষ্টি বাধায় দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে এগিয়ে রইলো বাংলাদেশ
  • এবার খোদ আইসিসি থেকে মিরাজের বার্তা এলো
  • সাকিবকে হিরো আখ্যা ও তার ব্যাটিং পছন্দ করেন নিউজিল্যান্ডের এই ক্রিকেট কিংবদন্তী
  • টাইগারদের ক্যাচ মিসের হিড়িক!
  • গতি ও বাউন্স দিয়ে ঘায়েল করে প্রতিশোধ নিলেন রুবেল!