আফতাব আহমেদ, একটি ঝরে পড়া তারার নাম…

আফতাব আহমেদ চৌধুরী। বাংলাদেশ জাতীয় দলের এক সময়কার নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। বয়সের অংক ছুঁয়েছে ত্রিশ। প্রায় দুবছর হতে চলল তুলে রেখেছেন ক্রিকেটের গ্লাভস-ব্যাট-প্যাড। কেমন আছেন তিনি?

মারকুটে এ ব্যাটসম্যানের জন্ম ১০ নভেম্বর ১৯৮৫ চট্টগ্রামে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পড়েছেন সেন্ট ম্যারি’স স্কুলে। ছোটবেলায় ক্রিকেটকে কিন্তু তিনি এতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। এমনকি বন্ধুবান্ধব ছেড়ে যেতে হবে বলে আসতে চাননি বিকেএসপিতেও। কিন্তু বাবা ছিলেন কট্টর ক্রীড়াসমর্থক। শেষমেশ বাবার জোরাজুরিতেই তার সিরিয়াসলি ক্রিকেটের জগতে পদার্পণ। যদিও বাবা তার জাতীয় দলে যোগদান দেখে যেতে পারেননি। বাবাকে হারান ‘৯৯ বিশ্বকাপের সময়।

ক্যারিয়ারের গৌরবোজ্জ্বল কিছু মুহূর্ত

অল্পতেই নির্বাচকদের নজরে আসেন তিনি, খেলেন ২০০২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। আত্মবিশ্বাসী মারকুটে ব্যাটিং-এ নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দেন তিনি। ২০০৪ এই ডাক পান টেস্ট স্কোয়াডে। প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে অভিষেক ঘটে তার। চট্টগ্রাম এম. এ. আজিজ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরে যায় ইনিংস ও ১০১ রানে। আফতাবের ব্যাট থেকে ম্যাচে তার একমাত্র ইনিংসে আসে ৩৯ বলে ২০ রান।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ প্রথম ইংল্যান্ডের মাটিতে খেলতে যায়। তার ব্যাটে ক্যারিয়ারের প্রথম ও একমাত্র টেস্ট হাফ সেঞ্চুরিটি আসে দলের জন্য হতাশাজনক এই সিরিজেই। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে তার অপরাজিত ৮২ রানে ভর করে বাংলাদেশ ইনিংসে সংগ্রহ করে ৩১৬ রান।

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার অভিষেক ২০০৪ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। ৪ মার্চ ইংল্যান্ডের মাটিতে অভিষেক ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শন পোলকের বলে পেছনে মার্ক বাউচারের হাতে ক্যাচ দিয়ে শুন্য রানে সাজঘরে ফিরে যান তিনি। ম্যাচটি বাংলাদেশ হেরে যায় ৯ উইকেটে।

আফতাব আহমেদের মেইডেন ওডিআই হাফ সেঞ্চুরিটা “ঐতিহাসিক”ই বলতে হয়। কারণ বাংলাদেশও যে সেদিন একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে শততম ম্যাচ খেলতে নেমেছিল! দিনটি ২৬ ডিসেম্বর ২০০৪। প্রতিপক্ষ ভারত, ভেনু বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, ঢাকা। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। ব্যাট হাতে তিনি করেন ১২৪ বলে ৬৭ রান।
উল্লেখ্য, খালেদ মাসুদ পাইলটের নেতৃত্বে এই ম্যাচেই বাংলাদেশ প্রথম ভারতের বিপক্ষে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে! বাংলাদেশ জিতে যায় ১৫ রানে!

২০০৫ সালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ প্রথম জয় পায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেখানে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরিটির কথা কার না মনে আছে? আফতাব আহমেদের ব্যাটও কিন্তু সেদিন জ্বলে উঠেছিল। জেসন গিলেস্পির করা শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে আফতাব আহমেদই তুলে নেন উইনিং রানটি। ব্যাট হাতে তিনি সেদিন করেন ২৮ বলে ২১ রান। জয়ের মুহূর্তে অন্য প্রান্তে স্ট্রাইক আগলে ছিলেন আরেক কিংবদন্তী স্পিনার মোহাম্মদ রফিক। বাংলাদেশ তুলে নেয় ৫ উইকেটের জয়।
এমনি বাংলাদেশ দলের বেশ কয়েকটি জয়ের সাক্ষী ছিলেন এই খেলোয়াড়।

বল হাতেও তার পারদর্শিতা নেহায়েতই কম নয়! কনিষ্ঠতম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় কিন্তু তাসকিন আহমেদ বা মুস্তাফিজুর রহমান নন, আফতাব আহমেদই উপরে!
ঘটনা ২০০৪ এর ৫ নভেম্বরের। ভেনু ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আফতাব ব্যাট হাতে দ্রুত ফিরে গেলেও বল হাতে ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রান দিয়ে তুলে নেন ৫ উইকেট। তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৬১ দিন! দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৩২ বল হাতে রেখে ম্যাচটি ৭ উইকেটে জিতে নেয় নিউজিল্যান্ড।

ক্যারিয়ারের ইতিকথা

সব গল্পের শেষটা ভাল হয়না। এ গল্পের নায়ক আফতাব আহমেদেরও ক্যারিয়ারের শেষাংশটা বিশেষ সুখকর নয়। ২০০৮ সালে বিতর্কিত ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল) -এ পাড়ি জমান বাংলাদেশের ১৪ ক্রিকেটার। হাবিবুল বাশার, শাহরিয়ার নাফিস, অলোক কাপালি, মোহাম্মদ রফিক, তাপস বৈশ্য, প্রমুখ তারকা ক্রিকেটারের সাথে যোগ দেন আফতাব আহমেদও। অনুমতি ছাড়া সেখানে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে।

আইসিএলে ঢাকা ওয়ারিয়রস দলের হয়ে একটি মৌসুম খেলার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বিসিবি তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ফিরে এসে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ডাক পান। তিনটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ২, ৪, ৪৬। ৮০ বলে ৪৬ রানের ইনিংসটিই ছিল লাল-সবুজের জার্সি গায়ে তার সর্বশেষ ওডিআই ইনিংস। সর্বশেষ টেস্টও খেলেন এই ইংল্যান্ড সিরিজেই। এরপর ২০১০ সালের ৫ মে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে শেষবার মাঠে নামেন এই অলরাউন্ডার।

অনেক দিন দলের বাইরে থাকায় ব্যাটে মরচে ধরে গিয়েছিল। ঠিক আগের মত মারকুটে ফর্মটা ফিরে পাচ্ছিলেন না, নতুন নতুন ট্যালেন্টের ভিরে জাতীয় দলের একাদশেও জায়গা মিলছিল না। ২০১৪ এর আগস্টে তিনি ২০১৪-১৫ মৌসুম শেষে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেবার ঘোষণা দেন। সর্বশেষ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে খেলে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
স্বল্পদৈর্ঘ্যের ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আফতাব আহমেদ খেলেছেন ৮৫টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ, খেলেছেন ১৬টি টেস্ট ও ১১টি টি২০।

এখন কেমন আছেন তিনি?

আছেন ক্রিকেট নিয়েই। ফিরে গেছেন নিজের শহরে, ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারিতে খুলেছেন নিজের আফতাব আহমেদ ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। ব্যাটিং ইমপ্রুভমেন্ট, বোলিং মেশিন, ফিটনেস ডেভেলপমেন্ট ও ভিডিও অ্যানালাইসিসসহ অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাই আছে এই ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে। সেখানে কিশোরদের কাছে বেশ জনপ্রিয় আফতাব ভাই। এখন তিনি বয়সভিত্তিক কোচিং দিয়ে ভালো কিছু খেলোয়াড় গড়ে তোলে দেশের ক্রিকেটকে আরও সমৃদ্ধ করতে চান। ভবিষ্যতে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হবার ইচ্ছেও রয়েছে তার।






Related News

  • সাকিব একটি অভদ্র খেলোয়াড়।তার ব্যবহার খারাপ : মাশরাফি
  • আফতাব আহমেদ, একটি ঝরে পড়া তারার নাম…
  • স্টুপিড! সৌরভকে অপমান করার অধিকার নেই শাস্ত্রীর, তোপ আজহারের
  • যে কারণে নিউজিল্যান্ড থেকে আতার আলীকে দেশে ফিরিয়ে আনছেন পাপন
  • আশরাফুল সম্পর্কে বাংলাদেশকে একটি বড় সুসংবাদ দিল আইসিসি, পাপন খুব খুশি
  • আশরাফুল কি দেখাইল : কই যারা আশরাফুলকে ফুল বলেন? তারা কুথায় ? কথা বলেন না কেন?
  • সাকিব আর সাব্বিরকে নিয়ে মাশরাফির আক্ষেপ
  • নিউজিল্যন্ড এর বিপক্ষে মোস্তাফিজের সেই বলিং